Posts

দালানবাড়ির গল্প

Image
  ধানক্ষেতের মাঝে দাঁড়িয়ে আছে প্রাচীণ দু'টি দালানবাড়ি  গ্রামে এসেছি দু’দিন হবে। সকালের খাবার খেয়ে বারান্দায় এসে দাঁড়ালাম। ঘন গাঢ় নীল আকাশের বুক চিরে ভেসে যাচ্ছে সাদা মেঘ। মেঘের ফাঁক গলে উঁকি দিচ্ছে সূর্য্যিমামা। বাড়ির গেট পার হতেই মা চেঁচিয়ে বললেন, “রৌদ্রে কোথাও যাস্ না।” আমিও চেঁচিয়ে বললাম, “এ-ই আসছি!” —বলেই বাহিরে বেরিয়ে এলাম। আমাদের গ্রামের গা ঘেঁষে বয়ে গেছে আঁকাবাঁকা মেঠোপথ। পথের পাশে পুকুর। পুকুরপাড়ে শিমুল, খেজুর, হিজল, কাঁঠাল ও সজনেগাছ। পুকুরের ওপাড়ে ধানক্ষেতের বুক চিরে— মাথা তুলে দাঁড়িয়ে আছে পাঁচশত বছরের প্রাচীন দু'টি দালানবাড়ি। আমি পথে বেরিয়ে পড়লাম। রাখাল ছেলেরা গরু-ছাগল নিয়ে যাচ্ছে মাঠে। রাস্তার পাশে কদম ও আকাশমণিগাছের সারি। আমি পুকুরপাড়ে এসে বসলাম। একটি মাছরাঙা ঠোঁটে মাছ তুলে শিমুলের ডালে গিয়ে বসলো। পুকুরের জলে রোদের কিরণ লেগে চিকচিক করছে। মাঝে-মাঝে মৃদু বাতাসে ধানক্ষেত থেকে ভ্যাপসা গন্ধ ভেসে আসছে। ছোট্ট একটি ফড়িং দেখে— হাত বাড়ালাম, টের পেয়েই ফড়িংটি ছুটে গেলো ধানক্ষেতে। আমিও নেমে গেলাম আলপথে। আমার পায়ের শব্দে দিগ্বিদিক ছুটছে অসংখ্য ঘাসফড়িং। একটি কোমল স্পর্শে দাঁড়িয়ে ...

জোছনাভেজা দিনলিপি

Image
  [একটি কালভার্ট, একফালি চাঁদ আর থোকা-থোকা ভালোলাগা] ০২ জুলাই ২০২৬; বৃহস্পতিবার; রাত ১:৪৫ টা  আজকের রাতটাকে লিখে না রাখলে অন্যায় হতো। কিছুদিন আগেও আমার সবুজ ছোট্ট গ্রামটা বন্যার পানিতে প্রায় ডুবে ছিল। সেই পানিই আজ পূর্ণিমার জোছনায় রূপ বদলে ফেলেছে। মনে হচ্ছে, প্রকৃতি যেন নিজের হাতে সব দুঃখ ধুয়ে তার ওপর সাদা আলো বিছিয়ে দিয়েছে। গ্রাম থেকে মেঠোপথ ধরে একটু দূরের ছোট্ট একটি কালভার্টে এসে বসেছি। হিমেল বাতাসে বাবরি চুলগুলো এলোমেলো হয়ে উড়ছে। সামনে যতদূর চোখ যায়, হাঁটু-সমান পানিতে ভরা মাঠ। পূর্ব আকাশে থালার মতো পূর্ণ চাঁদ, আর সেই চাঁদের আলো পানির বুকে নেমে এসে পুরো গ্রামটাকে রূপালি নীরবতায় মুড়ে দিয়েছে। পানির বুক থেকে ভেসে আসছে ব্যাঙের ডাক। রাস্তার দু'ধারে ঝিঁঝি পোকার একটানা সুর। দূরের সড়কে সারিবদ্ধ গাড়ির আলোগুলো ধীরে ধীরে এগিয়ে যাচ্ছে। মনে হচ্ছে, রাত নিজের জন্য কোনো শব্দ করছে না; প্রকৃতির প্রতিটি প্রাণী মিলে তার হয়ে কথা বলছে। মাঠের মাঝখানে একজন মানুষ হাঁটু পানিতে দাঁড়িয়ে মাছ ধরছেন। তাঁর ছোট্ট লাইটের আলো আর জোছনা মিলে এমন এক দৃশ্য তৈরি করেছে, যা কোনো ছবিতে পুরোপুরি ধরা য...

জামতলীর দিনগুলো...

Image
  গ্রামে ফারুক নামে আমার এক প্রতিবেশী আছে। কৈশোরের দিনগুলোর বড় একটা অংশ তার সাথেই কেটেছে। চৈত্রী দুপুরে- ছাতিফাটা রোদে মাঠ-ঘাট যখন খাঁ খাঁ করতো— মা আমাকে বিছানায় নিয়ে ঘুমপাড়ানি গানে, মাথায় হাত বুলিয়ে দিতো। আমিও চক্ষুবুজে চুপকরে থাকতাম। মায়ের হাতটা যখন থেমে যেতো, চোখমেলে দেখতাম- মা ঘুমিয়ে পড়েছে। পা টিপে টিপে বেরিয়ে আসতাম। এসে দেখতাম ঘরের পিছনে সজীব, মীম ও নাঈমসহ ফারুক আমার জন্য অপেক্ষা করছে। তারাও ঘুমফাঁকি দিয়ে পালিয়ে এসেছে। ফারুকের নেতৃত্বে ধানক্ষেত পেরিয়ে ছুটে যেতাম খাঁ-দের খেজুর বাগানে— সেখানে বড়সড় একটা জামগাছ আছে। ধানক্ষেতের ভেপসা গরম, মাথার উপর কাঠফাটা রোদ এরমাঝে আলপথে হেঁটে চলা! টসটসে লাল হয়ে যেতাম। কপাল বেয়ে টপটপ করে ঘাম ঝরতো। জামের নেশায় তখন এসব কিছুই মনে হতো না। জামতলীতে এসেই ধপ্ করে বসে পরতাম। আর ফারুক কয়েক লাফেই জামগাছের মাথায় উঠে যেতো। যেকোনো গাছ বাইতে বড্ডপটু সে! তারপর উঠতো— নাঈম, সজীব ও মীম। সবার শেষে উঠতাম আমি। ফারুক, নাঈম আর সজীব গাছের মগডাল থেকে থোকা থোকা জাম নিয়ে আসতো। মীম ও আমি সেগুলো জমা করতাম। সাথে নিয়ে যাওয়া পলিথিন ভরে গেলে, ফারুক ও নাঈম জামগুলো নিয়ে আগে নেমে য...

সূর্যাস্তের আগে...

Image
  প্রতীকী ছবি : ইজতিমা ময়দানে ব্লগার ও একদল তৃণমূল (খাবারের স্তুপে) সূর্যাস্তের আগে বিশ্ব ইজতিমার আখেরী মুনাজাত শেষ হয়েছে গতকাল। আজ তুরাগ তীরের সেই বিশাল ময়দান দেখতে বের হলাম।  কৌতূহল হচ্ছিল— যে মাঠে গতকালও লাখো মানুষের ঢল নেমেছিল, আজ সেটি কেমন দেখায়? কামারপাড়া ব্রিজ পার হয়ে এগোতে লাগলাম। আশেপাশে এখনও কিছু দোকান খোলা। শীতবস্ত্র বিক্রি হচ্ছে, চায়ের কাপে ধোঁয়া উঠছে। ময়দানের মূল ফটকের কাছে এসে দেখলাম, মেডিকেল ক্যাম্পের সামিয়ানা এখনও খোলা। পানির ট্যাংক, নিরাপত্তা বক্স, ময়দানের মানচিত্র— সবকিছুই যেন গতকালের স্মৃতি আঁকড়ে দাঁড়িয়ে আছে। মনে হচ্ছিল, এই তো গতকালও এখানে মানুষ ছিল। লাখো মানুষ। এত মানুষ যে, মাটিও দেখা যাচ্ছিল না। আজ চারদিকে শুধু নীরবতা। আমি উত্তর-পূর্ব কোণের গেট দিয়ে ময়দানে ঢুকলাম। কিন্তু কয়েক কদম এগোতেই হঠাৎ বুকের ভেতরটা ধক করে উঠল। দূরে একটা ডাস্টবিন। তার চারপাশে কিছু মানুষ জড়ো হয়ে আছে। প্রথমে ভাবলাম, হয়তো পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার কাজ চলছে। কিন্তু কাছে যেতে যেতে বুঝলাম, আমি ভুল দেখিনি— বরং যা দেখছি, তা বিশ্বাস করতে পারছি না। মানুষগুলো ডাস্টবিনের ভেতর থেকে খাবার কুড়িয়ে খাচ্ছ...

বিদায়ের ছায়ায় স্মৃতির আড্ডা

Image
  টোলপ্লাজার দিনগুলো যেন এখনো চোখের সামনে ভেসে ওঠে। জীবনের প্রথম কর্মক্ষেত্র, প্রথম অভিজ্ঞতা, প্রথম আপনজনের মতো প্রিয় সহযাত্রী—সব মিলেই ছিল এক অমূল্য অধ্যায়। আমি ছিলাম সবার ছোট্ট, আর তাই হয়তো সবার স্নেহ আমাকে আরও আলাদা করে ঘিরে রেখেছিল। স্মৃতির পাতায় এখনো উজ্জ্বল হয়ে ওঠেন নাসিম স্যার, ইঞ্জিনিয়ার ওবায়দুল স্যার তাঁদের আন্তরিক হাসি আর অনুপ্রেরণার হাতছানি। সহকর্মীদের ভিড়ে সবুজের প্রাণখোলা হাসি, নয়ন ভাইয়ের ভরসাময় উপস্থিতি, রাফসানের সরলতা আর আজিজুলের অশেষ আন্তরিকতা—সবকিছু মিলেই টোলপ্লাজার আকাশটা ছিল অন্যরকম উজ্জ্বল। পড়ন্ত বিকেলের আলোয়, যখন মেঘনার তীরে রোদ ঝিমিয়ে পড়ত, তখনই আমাদের আড্ডা জমে উঠত। নদীর ঢেউয়ের সঙ্গে মিশে যেত হাসি, গল্প আর স্বপ্নের রঙিন ছটা। মনে হতো, পৃথিবীর সব ক্লান্তি গলে যাচ্ছে এই সান্ধ্য আড্ডার উষ্ণতায়। কিন্তু জীবন থেমে থাকে না। বিদায়ের বাঁকে এসে দাঁড়ালে, সময় আমাদের আলাদা পথে টেনে নিয়ে যায়।  ছোট্ট জীবনে যত বিদায় জমেছে, তার ভাঁজে ভাঁজে এখন স্মৃতির ঝুড়ি পূর্ণ হয়ে উঠেছে। আর সেই ঝুড়ির গভীরে লুকিয়ে আছে আমাদের হাসি, আমাদের কথা, আমাদের বন্ধুত্বের অমলিন মুহূর্তগুলো। আজ যখন ফি...

চড়ুইভাতি

Image
  ফেলে আসা কৈশোরের দিনগুলোতে... তখন আমি মাদারীপুরে অধ্যায়নরত ছিলাম। ইংরেজি ২০১৭/১৮ খ্রিস্টাব্দ হবে।  প্রায় ছ'সাতমাস পর গ্রামে গেলাম। আমাকে পেয়ে সজীব, ফারুক, নাঈম আর মীম উৎফুল্ল হয়ে উঠেছিলো। খবর পেয়ে— তানজীমুল বাড়ি থেকে ছুটে এলো। নিতাই থেকে ছোট ফুপি এলো। আমাকে পেয়ে রিয়াদ ও হৃদয়ও খুব খুশি হলো।  সেদিন পড়ন্ত বিকেলে নাঈম, ফারুক ও সজীব সিদ্ধান্ত নিলো- আমাকে নিয়ে আজরাতে চড়ুইভাতি করবে।  রিয়াদ, হৃদয় আর তানজীমুল থাকায় এবারের চড়ুইভাতি ভিন্নভাবে একটু বড় পরিকল্পনায় হবে!  সজীব চাল দেবে, আমি মশলা ও তেল, নাইম রশুন আর আদা, ফারুক হলুদ, মরিচ ও লবণ নিয়ে আসবে। সাথে প্রত্যেকে ২০ টাকা করে দেবো; যা দিয়ে বাজার থেকে মাংস কিনে আনবো। জায়গা ঠিক হলো—নাঈমদের পুকুরপাড়ের খেজুর গাছের আড়ালে। সেখানে কেউ দেখতে পাবে না। যাবেও না। প্ল্যান মতো, সূর্যের আলোতেই সবাই মিলে সেখানকার আশপাশের ঝোপঝাড় পরিষ্কার করলাম।  প্রস্তুতির ঝড়ো হাওয়া... সন্ধ্যা ঘনিয়ে আসছে। পরিকল্পনা মতো সবাই বাড়ি থেকে লুকিয়ে-চুরিয়ে— চাল-ডাল, পিয়াজ, মরিচ, আদা-রশুন, ঘর বানানোর কাপড় ইত্যাদি নিয়ে এসে, পুকুরপাড়ে লুকিয়ে রাখলাম। কিন্তু ম...

চাঁদ-জোসনা-আমি

Image
  জানালার পর্দাটা সরাতেই একমুঠো জোছনা ছিটকে এলো মেঝেতে। পরিচ্ছন্ন আর পরিষ্কার আকাশে জ্বলজ্বল করছে আধখানা চাঁদ। ম্যাক্সিম গোর্কির মা উপন্যাসটা হাতে নিয়ে ছাদে উঠে এলাম। চারদিকে জোছনায় প্লাবিত হয়ে আছে। নিস্তব্ধ রাত, হালকা বাতাস, আর মৃদু পাতার খসখস শব্দ—সবকিছু মিলিয়ে এক অপার্থিব অনুভূতি। চাঁদের আলো ছড়িয়ে পড়েছে ছাদের রেলিং ধরে থাকা মানিপ্ল্যান্টের পাতায়। বাতাসের দোলায় পাতাগুলো যেন রূপালি আভায় জ্বলজ্বল করছে। আমি বইয়ের পাতায় চোখ রাখি, কিন্তু মনে হয়, প্রকৃতি আজ গল্পের চেয়েও বেশি জীবন্ত। প্রতিটি শব্দ, প্রতিটি বাক্য যেন এই রাতের সঙ্গে একাত্ম হয়ে যাচ্ছে। এক কাপ ধোঁয়া ওঠা কফি হাতে নিয়ে বসি ছাদের এক কোণে। দূরে কোথাও কুকুরের হালকা ডাক শোনা যাচ্ছে, মাঝে মাঝে কোনো রাতজাগা পাখির ডানার শব্দ বাতাসে মিশে যাচ্ছে। জোছনার আলোয় নিজের ছায়াটার দিকে তাকাই, মনে হয়, আমিও কি এক টুকরো গল্প হয়ে গেছি এই রাতের? বইয়ের পাতা উল্টাই, কিন্তু চোখ বারবার আকাশের দিকে চলে যায়। হয়তো চাঁদও আজ কিছু বলতে চায়, হয়তো এই রাতও কোনো গল্প বুনছে—যে গল্পের নাম ‘অবাক করা নিস্তব্ধতা’, যেখানে চাঁদ, জোছনা, হালকা বাতাস আর একাকী আমি এক অদৃশ্য...

অন্ধকার অরণ্য

Image
  ২রা রমাদান-২০২৫। মাগরিবের নামাজপড়ে বেরিয়ে এলাম রাস্তায়। সারাদিন রোজার ক্লান্তিতে, ইফতারের পর পুরো শরীর ঘেমে আসছে। আবাসিক থেকে বেড়িয়ে এলাম খোলা মাঠে। গোধূলির লালচে আলো ধীরে-ধীরে মলিন হয়ে আসছে। পশ্চিমের আকাশ যেন আগুনের মতো জ্বলছে, আর তার নিচে ছড়িয়ে আছে অস্পষ্ট ধোঁয়াশা। ৫০/৬০ একরে পরিত্যক্ত প্লটগুলোর ভেতর আমি একা। চারপাশে ঝোপঝাড়, জঙ্গল আর ভাঙাচোরা কংক্রিটের স্তূপ পড়ে আছে। যেন বহুদিন কেউ এখানে আসেনি। বাতাস ভারী, নিস্তব্ধতা চারপাশে জমাট বেঁধেছে। হাঁটতে-হাঁটতে আমি একটা নিচু দেয়ালে হেলান দিয়ে বসি। দূরের 'মেঘনা ফ্রেশ সিমেন্ট ফ্যাক্টরি' আর 'ফ্রেশ সিরামিক্সে' -এর চুল্লিগুলোকে এখন ধোঁয়াশার ভেতর ভাসমান দ্বীপের মতো লাগছে। দু’শ মিটার দূরে মেঘনা নদীর একটা ছোট্ট শাখা এঁকেবেঁকে চলে গেছে। যার পানিতে সন্ধ্যার আলো মিশে এক অদ্ভুত গাঢ় রঙ নিয়েছে। পাশেই অনেক বড়সড় একটি রেন্ডি গাছ। বিশালাকার কান্ড নিয়ে, মাটির দিকে ঝুলিয়ে আছে। লতাপাতায় ভরপুর। তার নিচে জমাট বেঁধেছে গাঢ় অন্ধকার। থেকে-থেকে পুরো মাঠজুড়ে ঝোপঝাড়ের মাঝে বেড়ে উঠেছে বড়ই গাছ। হঠাৎ ঝোপের ভেতর থেকে একটা চাপা আওয়াজ শোনা গেল। মনে হলো, যেন ...

পাকুরতলে সোনালি দুপুর

Image
    আমার কৈশোরের দিনগুলোর বিশাল একটা অংশ এখানেই লুকিয়ে আছে। শীতের সকালে খালি পাায়ে ছুটে আসতাম এই পাকুরতলীতে। এসে দেখতাম, পাখিরা কিচিরমিচির রবে পাকুরের ঘুম ভেঙে দিয়েছে। ততক্ষণে পূর্বাকাশ রক্তিম হয়ে উঠেছে। শিশিরভেজা সবুজ ঘাসে সোনালী রোদ হেঁসে উঠেছে। গ্রীষ্মের অলস দুপুরে মা যখন ঘুমোতে বলতো— মায়ের চোখ ফাঁকি দিয়ে ছুটে আসতাম পাকুরতলীতে। পাশ্বের গ্রামের রাখাল ছেলেদের ঘুড়ি উড়া, লুডু, পাইতা আরও নাম না জানা নানান খেলা দেখতাম। দুপুর গড়িয়ে বিকেল কাটিয়ে সবাই যখন বাড়ি ফিরতো, পাকুরতলীতে আনমনা হয়ে কি যেন ভাবতাম। দেখতাম, দূরের পল্লি থেকে ঝাঁকে ঝাঁকে পাখি উড়ে আসছে এই পাকুর গাছে। কিচিরমিচির রবে মাতিয়ে তুলতো পাকুর গাছটা। যেন সারাদিনের কর্মবিবরণী বলে দিচ্ছে পাকুরকে। গোধূলিলগ্নে পূর্বাকাশ যখন রক্তিম হয়ে আসতো, বিস্ময়ভরা চোখে তাকিয়ে দেখতাম— সূর্যের লুকোচুরি। চারদিকে যখন অন্ধকার হয়ে আসতো, খানিক দূরে তাকিয়ে দেখতাম— কে যেন দাঁড়িয়ে আছে। কাছে গিয়ে দেখতাম, সে আমার 'মা'। আমাকেই খুঁজেফিরে এখানেই এসেছে। আজ এই অনুভূতীগুলো এই ইট-পাথরের চার দেয়ালের মাঝে বন্দী হয়ে আছে!

মৃত্যুর অনুভূতি

Image
ঈদুল আযহার রাতের কথা। আমি খুব ক্লান্ত ছিলাম। তাই মশারী টানিয়েই শুয়ে পড়লাম। গরম ছিলো খুব কিন্তু, পাখা ছাড়তে মনে ছিলো না। মশারির ভিতরে দম বন্ধ হয়ে আসার জোগাড়, ঘামে যাকে বলে একেবারে গোসল! ক্লান্তি এত ছিলো যে,মশারি থেকে বের হতে মন চাচ্ছে না, কিন্তু উপায় কী! আগত্যা বের হলাম এবং পাখা ছেড়ে এসে শয়ন করলাম; শান্তি লাগলো এবং আরামের ঘুম হলো। ঘুমের আগে চিন্তা হলো, এই মশারি তো কবরেরই নমুনা! যদি আগে থেকেই আরামের ব্যাবস্থা করে ঢুকতাম, এতো কষ্ট হতো না। তদ্রূপ কবরে যদি আগে থেকেই ব্যাবস্থা না করে যাই তাহলে তো কষ্টের শেষ থাকবে না! মশারি থেকে তো বের হতে পেরেছি, তাই কষ্ট হলেও তা দূর করা গেছে; কিন্তু কবর থেকে তো বের হওয়া যাবে না! বাইশ/সাত/বাইশ

স্বপ্নপোড়ার গন্ধ!

Image
বঙ্গ মার্কেট, ঢাকা বাইতুল মোকাররমে জুমা পড়ে, মেরাজ ভাইসহ বঙ্গবাজারের দিকে যাচ্ছি। গুগলম্যাপ বেরকরে মেরাজ ভাই বললেন- আযীয ভাই, বঙ্গবাজার একসময় 'হকার্স মার্কেট' ছিলো; সেই থেকে দেশের 'সর্ববৃহৎ পাইকারি কাপড়ের মার্কেট' হয়ে উঠেছিলো। এখানের 'পাইকারি কাপড়' বাংলাদেশের প্রতিটি অঞ্চলে সেল হতো। রোজার প্রথম ভাগেই ব্যবসায়ীরা গুদাম স্টক করে রাখতেন; যা অন্য সময়ের চেয়ে দ্বিগুণ ছিলো। রকমারি, বাহারি কাপড়ের প্রাণকেন্দ্র ছিলো এটি। ঈদ উপলক্ষে ভীড় লেগেই থাকতো বঙ্গবাজারে। প্রতিদিন  হাজারো ব্যবসায়ী ছুটে আসতো এখানে... মেরাজ ভাইয়ের কথাগুলো শুনছি আর কল্পনায় যেন অবলোকন করছি। গুলিস্তানের 'সড়ক পাতাল মার্কেট' -এ পৌঁছানোর পর  মেরাজ ভাই বললেন, পাতাল মার্কেট দিয়ে রাস্তার ওপারে যেতে হবে। আমি অবাক হলাম যে, এমন পিচঢালা কংক্রিটের রাস্তার নীচে কিভাবে শতো শতো দোকান সাজানো হয়েছে!  কৌতুহলী চোখজোড়া নিয়ে পাতালপুরীতে ডুবলাম। নীচে নামার পর মনেহওয়া তো দূরের কথা কল্পনাও হলো না যে, এই মার্কেটের উপরে শতো শতো বাস ও ট্রাক অবিরাম ছুটছে... গুলিস্তান ফ্লাইওভারের মোড় ঘুরতেই কাপড়পোড়ার ঝাঝাঁলো গন্ধ শুকতে পেলাম। ...

তাড়াহুড়ো নয়, ধীরস্থির হউন!

Image
বার্ষিক পরীক্ষার দিনগুলো... বার্ষিক পরিক্ষা চলছে। মাগরীবের নামাজ পড়ে পড়তে বসেছি। কয়েকপৃষ্ঠা পাতা উল্টানোর পর, মাথায় যেন কিছুই ঢুকছে না। খুব ঘুম ঘুম লাগতেছে। একটু পড়তেছি তো ঝিমুচ্ছি। শরীরটা ঘর্মাক্ত হয়ে উঠেছে। কপালে ঝিরিঝিরি ঘাম জমতেছে। কি পড়তেছি নিজেও বুঝতেছি না। চোখ দু'টো নিজ থেকেই বুজে আসতেছে। ভাবলাম, এশা পর্যন্ত একটু ঘুমিয়ে নেয়া যাক্। এশার নামাজ পড়েই পড়তে বসবো। এলার্ম-ঘড়িটা কানের কাছে নিয়ে শুয়ে পড়লাম। ...ক্রিংক্রিংক্রিং তাড়াহুড়ো করে এশার নামাজ পড়ে, পড়ার টেবিলে আসলাম। যারপরনাই আগ্রহ ও মনোযোগ দিয়ে পড়তেছি। সবেমাত্র দু'একপৃষ্ঠা পড়েছি কি-না- ঝিমুনি যেন ঝাপটে ধরতে চাচ্ছে। লম্বা একটা হাই তুলে- টেবিলের পার্শ্বে রাখা মামপটের পানিগুলো, কয়েক ঢোকে গিলে নিলাম। পাঞ্জাবীর হাতা মুড়িয়ে বইয়ের পাতা উল্টাচ্ছি। বইয়ের কালো হরফগুলো ঝাপসা লাগতেছে। চশমার গ্লাসগুলো মুছে নিয়ে নবোদ্দমে বইয়ের পাতা উল্টাচ্ছি। দু'পৃষ্ঠা পড়লাম কি-না... (!) বইয়ের পাতাগুলো অস্পষ্ট লাগছে। শরীরটা ক্রমশঃ ছাড়িয়ে দিচ্ছে। চক্ষুদ্বয় বুজিয়ে আসছে। পুরো শরীর ঘেমে যাচ্ছে।  একটু নড়েচড়ে বসলাম। কপাল ভাঁজ করে পূর্ণোদ্দমে পড়ার চেষ্টা কর...

গ্রামের বটগাছটি!

Image
[শতবর্ষী বটগাছ] আমাদের গ্রামের বাড়ীর পাশে বিশাল বিস্তৃত আবাদি ভূমি। তার মাঝ দিয়েই বয়ে গেছে পায়ে হাঁটা প্রশস্ত খোলা পথটি। পথের পাশেই বিরাট একটি শতবর্ষী বটগাছ। গ্রীষ্মের আলস্য দুপুরে ছাতিফাটা রোদ যখন খাঁ খাঁ  করে—গায়ের চাষীরা মাঠের কাজ ফেলে ক্লান্ত দেহে তার ছায়ায় আশ্রয় নেয়। তখন তাদের দেখে মনে হয়, সেটা এক আশ্রয়কেন্দ্র। পথিকরা তার ছায়ায় একটু জিরোয়। দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে ঝেড়ে ফেলে পথের ক্লান্তি— এ যেন এক পান্থশালা। গাঁয়ের রাখাল ছেলেরা আসর জমায়— লুডু, পাইতা আরও নাম না জানা নানা খেলায়। বটমূলে ভীর জমায় গায়ের সাধারণ মানুষগুলোও। গোধূলিলগ্নে সূর্য্যের আলো যখন নিভে যায়, দলে দলে পাখির ঝাঁক উড়ে আসে, উদরপূর্তি করে। কিচিরমিচির রবে মুখরিত হয়ে উঠে আশপাশ। মনে হয়, সারাদিনের কার্যবিবরণী বলে দেয় বটগাছকে। এ যেন তাদের মিলন মেলা। আমার কেবল ইচ্ছে জাগে— আমি যদি হতাম বটগাছ কিংবা বটমূল! আমারও যদি থাকতো বিশাল বিস্তৃত ছায়া! মানুষ আমার ছায়ায় আশ্রয় নিতো কিংবা ক্লান্ত পথিক একটু দাঁড়াত! সন্ধ্যে নামার আগেই পাখিরা আশ্রয় নিতো! সবকিছুই বিসর্জন দিতে পারতাম পরকল্যাণে! বাইশ/বারো/একুশ