Sunday, June 21, 2026

সূর্যাস্তের আগে...

 

প্রতীকী ছবি : ইজতিমা ময়দানে ব্লগার ও একদল তৃণমূল (খাবারের স্তুপে)

সূর্যাস্তের আগে

বিশ্ব ইজতিমার আখেরী মুনাজাত শেষ হয়েছে গতকাল।
আজ তুরাগ তীরের সেই বিশাল ময়দান দেখতে বের হলাম। 
কৌতূহল হচ্ছিল— যে মাঠে গতকালও লাখো মানুষের ঢল নেমেছিল, আজ সেটি কেমন দেখায়?

কামারপাড়া ব্রিজ পার হয়ে এগোতে লাগলাম। আশেপাশে এখনও কিছু দোকান খোলা। শীতবস্ত্র বিক্রি হচ্ছে, চায়ের কাপে ধোঁয়া উঠছে। ময়দানের মূল ফটকের কাছে এসে দেখলাম, মেডিকেল ক্যাম্পের সামিয়ানা এখনও খোলা। পানির ট্যাংক, নিরাপত্তা বক্স, ময়দানের মানচিত্র— সবকিছুই যেন গতকালের স্মৃতি আঁকড়ে দাঁড়িয়ে আছে।
মনে হচ্ছিল, এই তো গতকালও এখানে মানুষ ছিল।
লাখো মানুষ।
এত মানুষ যে, মাটিও দেখা যাচ্ছিল না।

আজ চারদিকে শুধু নীরবতা।
আমি উত্তর-পূর্ব কোণের গেট দিয়ে ময়দানে ঢুকলাম।
কিন্তু কয়েক কদম এগোতেই হঠাৎ বুকের ভেতরটা ধক করে উঠল।
দূরে একটা ডাস্টবিন।
তার চারপাশে কিছু মানুষ জড়ো হয়ে আছে।
প্রথমে ভাবলাম, হয়তো পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার কাজ চলছে। কিন্তু কাছে যেতে যেতে বুঝলাম, আমি ভুল দেখিনি— বরং যা দেখছি, তা বিশ্বাস করতে পারছি না।

মানুষগুলো ডাস্টবিনের ভেতর থেকে খাবার কুড়িয়ে খাচ্ছে।
পঁচা খাবার।
উচ্ছিষ্ট খাবার।
আর তাদের পাশে একঝাঁক কুকুরও একই খাবারের জন্য লড়ছে।
আমি থমকে দাঁড়িয়ে গেলাম।
কিছুক্ষণ মনে হলো, পৃথিবীর সমস্ত শব্দ হারিয়ে গেছে।
কেবল কুকুরগুলোর ঘেউঘেউ আর প্লাস্টিকের শব্দ।
আর কিছু না।

আমি ধীরে ধীরে আরও কাছে গেলাম।
দেখলাম, সেখানে কয়েকজন বৃদ্ধ মানুষ আছে।
একজন বৃদ্ধা নারী আছে।
আর আছে কয়েকটি শিশু।
একটি শিশুর বয়স হয়তো সাত কিংবা আট।
তার হাতে একটি আধাপচা খাবারের টুকরো।
সে এমনভাবে খাচ্ছে, যেন পৃথিবীর সবচেয়ে সুস্বাদু খাবার সেটিই।

আমার বুকের ভেতরটা মোচড় দিয়ে উঠল।
ব্যাগ থেকে পানির বোতল বের করলাম।
শিশুটির দিকে বাড়িয়ে দিলাম।
সে তাকাল না।
আরও একটু কাছে গিয়ে বললাম,
— পানি খাবে?
কোনো উত্তর নেই।
সে ব্যস্ত খাবারের টুকরোটা বাঁচাতে।
মনে হলো, সে ভয় পাচ্ছে— কেউ যদি তার খাবারটা ছিনিয়ে নেয়!

আমি নির্বাক হয়ে গেলাম।
তখনই প্রথম একজন বৃদ্ধ আমার দিকে তাকালেন।
কী অদ্ভুত সেই দৃষ্টি!
সেখানে রাগ নেই।
অভিযোগ নেই।
অনুনয়ও নেই।
শুধু এক ধরনের শূন্যতা।
যেন বহু বছর আগে তিনি পৃথিবীর কাছে অভিযোগ করা ছেড়ে দিয়েছেন।

আমি নিজের দিকে তাকালাম।
আমার গায়ে উষ্ণ কোট।
পায়ে জুতো।
চোখে চশমা।
কাঁধে ব্যাগ।
আর ওদের দিকে তাকালাম।
শীতের মধ্যে কাঁপতে থাকা শরীর।
ময়লা কাপড়।
ক্ষুধায় শুকিয়ে যাওয়া মুখ।
হঠাৎ নিজের অস্তিত্বটাই ভারী মনে হতে লাগল।

আমি আর সেখানে দাঁড়িয়ে থাকতে পারলাম না।
ধীরে-ধীরে, হাঁটতে-হাঁটতে তুরাগ নদীর তীরে গিয়ে বসলাম।
সূর্য তখন পশ্চিম আকাশে হেলে পড়েছে।
নদীর জল চিকচিক করছে।
সাধারণত সূর্যাস্ত আমার খুব ভালো লাগে।
কিন্তু সেদিন না।
সেদিন সূর্যাস্তের দিকে তাকিয়ে আমি কেবল সেই শিশুটির মুখ দেখছিলাম।
যার হাতে আধাপচা রুটির টুকরো ছিলো।

ভাবছিলাম—
এই শহরে কেউ খাবার ফেলে দেয়।
আর কেউ সেই ফেলে দেওয়া খাবারের জন্য, কুকুরের সঙ্গে লড়াই করে।
আমরা একই দেশে বাস করি।
একই আকাশের নিচে থাকি।
একই সূর্যের আলোয় হাঁটি।
তবুও আমাদের পৃথিবী এত আলাদা কেন?

হঠাৎ বুঝতে পারলাম, আমার চোখ ভিজে উঠেছে।
আমি মাথা নিচু করলাম।
তুরাগের বাতাস বয়ে যাচ্ছিল।
সূর্য ধীরে ধীরে ডুবে যাচ্ছিল।
আর আমি অনুভব করছিলাম—
সেদিন আমি কোনো ডাস্টবিন দেখিনি।
কোনো ক্ষুধার্ত মানুষও দেখিনি।
আমি দেখেছি আমাদের সভ্যতার সবচেয়ে লজ্জাজনক মুখ।

সূর্য ডুবে গেল।
আকাশ অন্ধকার হয়ে এলো।
কিন্তু আমার ভেতরে যে অন্ধকার নেমে এসেছিল, 
তার চেয়ে গভীর অন্ধকার আমি আগে কখনও দেখিনি।
সেদিনও সূর্যাস্ত হয়েছিল।
কিন্তু সে সূর্যাস্তের কোনো সৌন্দর্য ছিল না।

০৩/০৩/২০২৪
[ডায়েরির পাতা থেকে]

No comments:

Post a Comment

জনপ্রিয় আর্টিকেলগুলো দেখুন...

জামতলীর দিনগুলো...

  গ্রামে ফারুক নামে আমার এক প্রতিবেশী আছে। কৈশোরের দিনগুলোর বড় একটা অংশ তার সাথেই কেটেছে। চৈত্রী দুপুরে- ছাতিফাটা রোদে মাঠ-ঘাট যখন খাঁ খাঁ ক...