Sunday, June 21, 2026

জামতলীর দিনগুলো...

 

গ্রামে ফারুক নামে আমার এক প্রতিবেশী আছে। কৈশোরের দিনগুলোর বড় একটা অংশ তার সাথেই কেটেছে। চৈত্রী দুপুরে- ছাতিফাটা রোদে মাঠ-ঘাট যখন খাঁ খাঁ করতো— মা আমাকে বিছানায় নিয়ে ঘুমপাড়ানি গানে, মাথায় হাত বুলিয়ে দিতো। আমিও চক্ষুবুজে চুপকরে থাকতাম। মায়ের হাতটা যখন থেমে যেতো, চোখমেলে দেখতাম- মা ঘুমিয়ে পড়েছে। পা টিপে টিপে বেরিয়ে আসতাম। এসে দেখতাম ঘরের পিছনে সজীব, মীম ও নাঈমসহ ফারুক আমার জন্য অপেক্ষা করছে। তারাও ঘুমফাঁকি দিয়ে পালিয়ে এসেছে। ফারুকের নেতৃত্বে ধানক্ষেত পেরিয়ে ছুটে যেতাম খাঁ-দের খেজুর বাগানে— সেখানে বড়সড় একটা জামগাছ আছে। ধানক্ষেতের ভেপসা গরম, মাথার উপর কাঠফাটা রোদ এরমাঝে আলপথে হেঁটে চলা! টসটসে লাল হয়ে যেতাম। কপাল বেয়ে টপটপ করে ঘাম ঝরতো। জামের নেশায় তখন এসব কিছুই মনে হতো না। জামতলীতে এসেই ধপ্ করে বসে পরতাম। আর ফারুক কয়েক লাফেই জামগাছের মাথায় উঠে যেতো। যেকোনো গাছ বাইতে বড্ডপটু সে! তারপর উঠতো— নাঈম, সজীব ও মীম। সবার শেষে উঠতাম আমি। ফারুক, নাঈম আর সজীব গাছের মগডাল থেকে থোকা থোকা জাম নিয়ে আসতো। মীম ও আমি সেগুলো জমা করতাম। সাথে নিয়ে যাওয়া পলিথিন ভরে গেলে, ফারুক ও নাঈম জামগুলো নিয়ে আগে নেমে যেতো। তারপর আমরা নেমে আসতাম। জামতলীতে বসে জামগুলো সমানভাবে ভাগ করতাম। কেউ কোন অংশে কমবেশি করতাম না। তারপর প্রাপ্ত জামগুলো কলাপাতা কিংবা কচুপাতায় মুড়িয়ে নিয়ে আলপথে ছুটে যেতাম পাকুড়তলীতে। পাকুড়ের শিকড়ে বসে বসে জাম খেতাম আর পা-গুলো ঝুলিয়ে দিতাম পুকুরের পানিতে! পাকুড়গাছে পাখিদের হৈচৈ, পানিতে রোদের কিরণ, আর স্নিগ্ধ বাতাসে কাঁচা ধানের মৌ মৌ গন্ধ ভেষে আসতো! আহ, কী-যে ভালো লাগত!! রূপকথার নানান গল্পে মেতে যেতাম আর জামের বিচি দিয়ে পানিতে ঢিলছুড়ার প্রতিযোগিতা করতাম। এভাবেই কেটে যেতো গ্রীষ্মের দুপুর...

সূর্যাস্তের আগে...

 

প্রতীকী ছবি : ইজতিমা ময়দানে ব্লগার ও একদল তৃণমূল (খাবারের স্তুপে)

সূর্যাস্তের আগে

বিশ্ব ইজতিমার আখেরী মুনাজাত শেষ হয়েছে গতকাল।
আজ তুরাগ তীরের সেই বিশাল ময়দান দেখতে বের হলাম। 
কৌতূহল হচ্ছিল— যে মাঠে গতকালও লাখো মানুষের ঢল নেমেছিল, আজ সেটি কেমন দেখায়?

কামারপাড়া ব্রিজ পার হয়ে এগোতে লাগলাম। আশেপাশে এখনও কিছু দোকান খোলা। শীতবস্ত্র বিক্রি হচ্ছে, চায়ের কাপে ধোঁয়া উঠছে। ময়দানের মূল ফটকের কাছে এসে দেখলাম, মেডিকেল ক্যাম্পের সামিয়ানা এখনও খোলা। পানির ট্যাংক, নিরাপত্তা বক্স, ময়দানের মানচিত্র— সবকিছুই যেন গতকালের স্মৃতি আঁকড়ে দাঁড়িয়ে আছে।
মনে হচ্ছিল, এই তো গতকালও এখানে মানুষ ছিল।
লাখো মানুষ।
এত মানুষ যে, মাটিও দেখা যাচ্ছিল না।

আজ চারদিকে শুধু নীরবতা।
আমি উত্তর-পূর্ব কোণের গেট দিয়ে ময়দানে ঢুকলাম।
কিন্তু কয়েক কদম এগোতেই হঠাৎ বুকের ভেতরটা ধক করে উঠল।
দূরে একটা ডাস্টবিন।
তার চারপাশে কিছু মানুষ জড়ো হয়ে আছে।
প্রথমে ভাবলাম, হয়তো পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার কাজ চলছে। কিন্তু কাছে যেতে যেতে বুঝলাম, আমি ভুল দেখিনি— বরং যা দেখছি, তা বিশ্বাস করতে পারছি না।

মানুষগুলো ডাস্টবিনের ভেতর থেকে খাবার কুড়িয়ে খাচ্ছে।
পঁচা খাবার।
উচ্ছিষ্ট খাবার।
আর তাদের পাশে একঝাঁক কুকুরও একই খাবারের জন্য লড়ছে।
আমি থমকে দাঁড়িয়ে গেলাম।
কিছুক্ষণ মনে হলো, পৃথিবীর সমস্ত শব্দ হারিয়ে গেছে।
কেবল কুকুরগুলোর ঘেউঘেউ আর প্লাস্টিকের শব্দ।
আর কিছু না।

আমি ধীরে ধীরে আরও কাছে গেলাম।
দেখলাম, সেখানে কয়েকজন বৃদ্ধ মানুষ আছে।
একজন বৃদ্ধা নারী আছে।
আর আছে কয়েকটি শিশু।
একটি শিশুর বয়স হয়তো সাত কিংবা আট।
তার হাতে একটি আধাপচা খাবারের টুকরো।
সে এমনভাবে খাচ্ছে, যেন পৃথিবীর সবচেয়ে সুস্বাদু খাবার সেটিই।

আমার বুকের ভেতরটা মোচড় দিয়ে উঠল।
ব্যাগ থেকে পানির বোতল বের করলাম।
শিশুটির দিকে বাড়িয়ে দিলাম।
সে তাকাল না।
আরও একটু কাছে গিয়ে বললাম,
— পানি খাবে?
কোনো উত্তর নেই।
সে ব্যস্ত খাবারের টুকরোটা বাঁচাতে।
মনে হলো, সে ভয় পাচ্ছে— কেউ যদি তার খাবারটা ছিনিয়ে নেয়!

আমি নির্বাক হয়ে গেলাম।
তখনই প্রথম একজন বৃদ্ধ আমার দিকে তাকালেন।
কী অদ্ভুত সেই দৃষ্টি!
সেখানে রাগ নেই।
অভিযোগ নেই।
অনুনয়ও নেই।
শুধু এক ধরনের শূন্যতা।
যেন বহু বছর আগে তিনি পৃথিবীর কাছে অভিযোগ করা ছেড়ে দিয়েছেন।

আমি নিজের দিকে তাকালাম।
আমার গায়ে উষ্ণ কোট।
পায়ে জুতো।
চোখে চশমা।
কাঁধে ব্যাগ।
আর ওদের দিকে তাকালাম।
শীতের মধ্যে কাঁপতে থাকা শরীর।
ময়লা কাপড়।
ক্ষুধায় শুকিয়ে যাওয়া মুখ।
হঠাৎ নিজের অস্তিত্বটাই ভারী মনে হতে লাগল।

আমি আর সেখানে দাঁড়িয়ে থাকতে পারলাম না।
ধীরে-ধীরে, হাঁটতে-হাঁটতে তুরাগ নদীর তীরে গিয়ে বসলাম।
সূর্য তখন পশ্চিম আকাশে হেলে পড়েছে।
নদীর জল চিকচিক করছে।
সাধারণত সূর্যাস্ত আমার খুব ভালো লাগে।
কিন্তু সেদিন না।
সেদিন সূর্যাস্তের দিকে তাকিয়ে আমি কেবল সেই শিশুটির মুখ দেখছিলাম।
যার হাতে আধাপচা রুটির টুকরো ছিলো।

ভাবছিলাম—
এই শহরে কেউ খাবার ফেলে দেয়।
আর কেউ সেই ফেলে দেওয়া খাবারের জন্য, কুকুরের সঙ্গে লড়াই করে।
আমরা একই দেশে বাস করি।
একই আকাশের নিচে থাকি।
একই সূর্যের আলোয় হাঁটি।
তবুও আমাদের পৃথিবী এত আলাদা কেন?

হঠাৎ বুঝতে পারলাম, আমার চোখ ভিজে উঠেছে।
আমি মাথা নিচু করলাম।
তুরাগের বাতাস বয়ে যাচ্ছিল।
সূর্য ধীরে ধীরে ডুবে যাচ্ছিল।
আর আমি অনুভব করছিলাম—
সেদিন আমি কোনো ডাস্টবিন দেখিনি।
কোনো ক্ষুধার্ত মানুষও দেখিনি।
আমি দেখেছি আমাদের সভ্যতার সবচেয়ে লজ্জাজনক মুখ।

সূর্য ডুবে গেল।
আকাশ অন্ধকার হয়ে এলো।
কিন্তু আমার ভেতরে যে অন্ধকার নেমে এসেছিল, 
তার চেয়ে গভীর অন্ধকার আমি আগে কখনও দেখিনি।
সেদিনও সূর্যাস্ত হয়েছিল।
কিন্তু সে সূর্যাস্তের কোনো সৌন্দর্য ছিল না।

০৩/০৩/২০২৪
[ডায়েরির পাতা থেকে]

Sunday, August 31, 2025

বিদায়ের ছায়ায় স্মৃতির আড্ডা

 

টোলপ্লাজার দিনগুলো যেন এখনো চোখের সামনে ভেসে ওঠে। জীবনের প্রথম কর্মক্ষেত্র, প্রথম অভিজ্ঞতা, প্রথম আপনজনের মতো প্রিয় সহযাত্রী—সব মিলেই ছিল এক অমূল্য অধ্যায়। আমি ছিলাম সবার ছোট্ট, আর তাই হয়তো সবার স্নেহ আমাকে আরও আলাদা করে ঘিরে রেখেছিল।
স্মৃতির পাতায় এখনো উজ্জ্বল হয়ে ওঠেন নাসিম স্যার, ইঞ্জিনিয়ার ওবায়দুল স্যার তাঁদের আন্তরিক হাসি আর অনুপ্রেরণার হাতছানি। সহকর্মীদের ভিড়ে সবুজের প্রাণখোলা হাসি, নয়ন ভাইয়ের ভরসাময় উপস্থিতি, রাফসানের সরলতা আর আজিজুলের অশেষ আন্তরিকতা—সবকিছু মিলেই টোলপ্লাজার আকাশটা ছিল অন্যরকম উজ্জ্বল।

পড়ন্ত বিকেলের আলোয়, যখন মেঘনার তীরে রোদ ঝিমিয়ে পড়ত, তখনই আমাদের আড্ডা জমে উঠত। নদীর ঢেউয়ের সঙ্গে মিশে যেত হাসি, গল্প আর স্বপ্নের রঙিন ছটা। মনে হতো, পৃথিবীর সব ক্লান্তি গলে যাচ্ছে এই সান্ধ্য আড্ডার উষ্ণতায়।
কিন্তু জীবন থেমে থাকে না। বিদায়ের বাঁকে এসে দাঁড়ালে, সময় আমাদের আলাদা পথে টেনে নিয়ে যায়। 

ছোট্ট জীবনে যত বিদায় জমেছে, তার ভাঁজে ভাঁজে এখন স্মৃতির ঝুড়ি পূর্ণ হয়ে উঠেছে। আর সেই ঝুড়ির গভীরে লুকিয়ে আছে আমাদের হাসি, আমাদের কথা, আমাদের বন্ধুত্বের অমলিন মুহূর্তগুলো।
আজ যখন ফিরে দেখি, টোলপ্লাজার দিনগুলো শুধু কর্মক্ষেত্রের স্মৃতি নয়—ওগুলো আমার জীবনের এক সোনালি অধ্যায়, যেখানে আমি মানুষ হয়ে ওঠার পাঠ শিখেছি, সম্পর্কের উষ্ণতা পেয়েছি, আর স্মৃতির ভাণ্ডারে অমূল্য রত্ন সংগ্রহ করেছি।
সত্যিই, কিছু মানুষ আর কিছু সময় হারিয়ে যায় না; তারা কেবল মনের গহীনে চিরকালীন হয়ে বেঁচে থাকে।

Wednesday, April 2, 2025

চড়ুইভাতি

 



ফেলে আসা কৈশোরের দিনগুলোতে...

তখন আমি মাদারীপুরে অধ্যায়নরত ছিলাম। ইংরেজি ২০১৭/১৮ খ্রিস্টাব্দ হবে। 

প্রায় ছ'সাতমাস পর গ্রামে গেলাম। আমাকে পেয়ে সজীব, ফারুক, নাঈম আর মীম উৎফুল্ল হয়ে উঠেছিলো। খবর পেয়ে— তানজীমুল বাড়ি থেকে ছুটে এলো। নিতাই থেকে ছোট ফুপি এলো। আমাকে পেয়ে রিয়াদ ও হৃদয়ও খুব খুশি হলো। 


সেদিন পড়ন্ত বিকেলে নাঈম, ফারুক ও সজীব সিদ্ধান্ত নিলো- আমাকে নিয়ে আজরাতে চড়ুইভাতি করবে। 

রিয়াদ, হৃদয় আর তানজীমুল থাকায় এবারের চড়ুইভাতি ভিন্নভাবে একটু বড় পরিকল্পনায় হবে! 

সজীব চাল দেবে, আমি মশলা ও তেল, নাইম রশুন আর আদা, ফারুক হলুদ, মরিচ ও লবণ নিয়ে আসবে। সাথে প্রত্যেকে ২০ টাকা করে দেবো; যা দিয়ে বাজার থেকে মাংস কিনে আনবো। জায়গা ঠিক হলো—নাঈমদের পুকুরপাড়ের খেজুর গাছের আড়ালে। সেখানে কেউ দেখতে পাবে না। যাবেও না। প্ল্যান মতো, সূর্যের আলোতেই সবাই মিলে সেখানকার আশপাশের ঝোপঝাড় পরিষ্কার করলাম। 


প্রস্তুতির ঝড়ো হাওয়া...

সন্ধ্যা ঘনিয়ে আসছে।

পরিকল্পনা মতো সবাই বাড়ি থেকে লুকিয়ে-চুরিয়ে— চাল-ডাল, পিয়াজ, মরিচ, আদা-রশুন, ঘর বানানোর কাপড় ইত্যাদি নিয়ে এসে, পুকুরপাড়ে লুকিয়ে রাখলাম। কিন্তু মীম বিষন্ন মনে এসে বললো, তাকে রাত্রী বেলায় বাড়ি থেকে বের হতে দেবে না। কারো সাথে থাকতেও পারবে না। চড়ুইভাতির কথা শুনলে, তার বাবা-মা ভীষণ রাগ করবে। কী করা যায়...

ভাবতে-ভাবতে ফারুক ও সজীব তাকে আইডিয়া দিয়ে বললো, তুই তোর মা'কে বলবি— আজ রাতে আযীয আংকেলের সাথে থাকবি। কিছু বললে বলবি, আংকেল থাকতে বলেছে। ব্যাস!


মাগরীবের পর...

তালপুকুরের মেঠোপথ ধরে সবাই মিলে হাজারীহাট গেলাম মুরগী কিনতে। মুরগীর ব্যাগ নিয়ে কী-যে আনন্দে ফিরছিলাম! মনে হচ্ছিল, আমরা ৮ জন দিগ্বিদিক জয় করে ফিরতেছি! পথটা যেন দ্রুতই ফুরিয়ে গেলো।

মুরগীর ব্যাগসহ পুকুরপাড়ে চলে এলাম। সিদ্ধান্ত হলো, যার-যার মতো করে ম্যানেজ করে, রাত সাড়ে দশটায় পুলেরপাড়ে একত্রিত হবো। 


চুড়ান্ত অভিযান...

রাত সাড়ে বারোটা। ফারুক, নাঈম আর সজীব গেলো লাকড়ি জোগাড় করতে। রনি আর তানজীমুল পা টিপেটিপে গেলো রান্নাঘরে, রান্নার পাতিল আনতে। মীম আর রিয়াদ গেলো পানি আনতে। আমি হৃদয়কে নিয়ে গেলাম পুকুরপাড়ে রান্নার প্রণালী তৈরি করতে...


ভূতের ভয়, অন্ধকারে ভয়ের পেছনে যে গল্প ছিল

আমি চাল-ডাল ও পিয়াজ-মরিচগুলো প্রস্তুত করছি। হৃদয় পাশে বসে আছে। এমন সময় সে বাঁশঝাড়ের দিকে তাকিয়ে চিৎকার করে ওঠে এবং আমাকে ঝাপটে ধরে। আমি ওর মুখ চেপেধরি। ও চিৎকার দিয়ে বলে, ভাইয়া ওটা কি! ওটা কি!! আমিও ভয়ে জড়োসড়ো হয়ে উঠি। ভয়ে সেদিকে তাকানোর সাহস পাই না। আশেপাশে তখন কেউ নেই। গুমোট অন্ধকার। হৃদয় ভয়ে কাঁপছে আর আমার বুকে ওর মুখটা লুকিয়ে রেখেছে। ক্রমশঃ আমার বুক কেঁপে ওঠে। বিভিন্ন জল্পনা-কল্পনা মাথায় ভেষে ওঠে। মনে-মনে নানান দোয়া-দরুদ পড়তে থাকি। হৃদয় কেঁদে ওঠে, বায়না ধরে বাসায় যাবে। আমি শক্ত করে ওর মুখ চেপে ধরি। আর বুঝানোর চেষ্টা করি। ও শক্ত করে আমাকে ঝাপটে ধরে আছে। আমার মনে হচ্ছে, সাদা কাপড় পরিহিত কেউ একজন আমার পিছনে, বিশালাকার দেহ নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। মাথা ঘোরালেই ঘার মটকে দেবে! আমার গা শিউরে ওঠে। হৃদয়কে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে ঠাঁই দাঁড়িয়ে আছি। আমি মাথা তোলার সাহস পাচ্ছি না। 

হটাৎ হৃদয় আবারও চিৎকার করে বলে উঠলো ভাইয়া ওটা কী? ভুত ভুত! আমি ওর মুখ চেপে ধরলাম। ও কেঁদে উঠলো। আমিও তাকে জড়িয়ে ধরে ফুঁপিয়ে উঠলাম। দেখি, পুকুরের ওপাড়ে দু'টি আত্মা বড়বড় লাঠি নিয়ে দৌড়াদৌড়ি করতেছে! আমার গা ঘেমে উঠলো! চিৎকার করতে চেয়েও পারলাম না, মনে হলো- অদৃশ্য একটি হাত আমার কণ্ঠনালী চেপে ধরেছে। হৃদয় একেবারে চুপসে গেছে। আমি আত্মা দু'টোর দিকে তাকাচ্ছি আর কাঁপতেছি। হৃদয় সেদিকে তাকাতেই চিৎকার করে উঠলো! ভয়ে জড়োসড়ো হয়ে কাঁপতে লাগলো। ওর সাথে আমিও চিৎকার দিয়ে উঠলাম। সাথে সাথেই আত্মা দু'টো দৌড়ে আমাদের কাছে আসলো। এসেই নাঈম বললো, কী হয়েছে ভাইয়া? আমি চমকে গেলাম! বললাম, তোরা! তোরা এখানে ছিলি? ফারুক ফিসফিস করে বললো, ঐদিকে লাকড়ি পেলাম না। তাই এখানে এসেছি। সাথে-সাথে মীম, রিয়াদ, রনি ও সজীবও আসলো। আমি ওদের সবাইকে বিষয়টি খুলে বললাম। ওরা খিলখিল করে হেসে উঠলো। কিন্তু হৃদয় কিছুই বুঝতে পারলো না, কেবল ভয়ে কাঁপতে লাগলো। আর বাসায় যাওয়ার বায়না ধরলো। নাঈম, ফারুক আর সজীব কাপড় দিয়ে চতুর্দিকটা ঘিরে দিলো; যাতে হৃদয় বাহিরের কোনকিছু দেখতে না পায়। মীম, রিয়াদ ও রনি হৃদয়কে তাদের মাঝখানে বসিয়ে নিলো। 

 

রান্নাবান্নায়...

কাপড়ের ঘেরা ছোট্ট ঘরের ভেতর আমরা রান্নাবান্না শুরু করলাম। নাঈম চুলোয় জ্বাল দিচ্ছে। আমি আর ফারুক রান্না করছি। চুলোর সামনে সবাই ছোট্ট হৃদয়কে নিয়ে ফিসফিসিয়ে মজা করছে।

ভাত রান্না করার পর কীভাবে মার গলাতে হবে কেউ বুঝতে পারছিলাম না। ফারুক ঝটপট একটি আইডিয়া বের করলো। দু'টো কলাপাতা লম্বালম্বি দিয়ে ভাতগুলো সেখানে ঢেলে দিলো। চতুর্দিক দিয়ে মারগুলো বেয়ে গেলো; কিন্তু ভাতগুলো ভেজায় থাকলো। 

মাংস রান্না শেষে কলাপাতায় সকলে ভাত তুলে নিলাম। ভেজাভাতে লবন ও ঝালে চড়া মাংসের স্বাদ আজও আমার জিভে লেগে আছে। পুকুরপাড়ে দাঁড়ালে মনের অজান্তেই হেঁসে উঠি। ছুটে যাই ফেলে আসা সেই কৈশোরের দুরন্তপনায়... 


▪️ঢাকা

Sunday, March 9, 2025

চাঁদ-জোসনা-আমি


 জানালার পর্দাটা সরাতেই একমুঠো জোছনা ছিটকে এলো মেঝেতে। পরিচ্ছন্ন আর পরিষ্কার আকাশে জ্বলজ্বল করছে আধখানা চাঁদ। ম্যাক্সিম গোর্কির মা উপন্যাসটা হাতে নিয়ে ছাদে উঠে এলাম। চারদিকে জোছনায় প্লাবিত হয়ে আছে। নিস্তব্ধ রাত, হালকা বাতাস, আর মৃদু পাতার খসখস শব্দ—সবকিছু মিলিয়ে এক অপার্থিব অনুভূতি।


চাঁদের আলো ছড়িয়ে পড়েছে ছাদের রেলিং ধরে থাকা মানিপ্ল্যান্টের পাতায়। বাতাসের দোলায় পাতাগুলো যেন রূপালি আভায় জ্বলজ্বল করছে। আমি বইয়ের পাতায় চোখ রাখি, কিন্তু মনে হয়, প্রকৃতি আজ গল্পের চেয়েও বেশি জীবন্ত। প্রতিটি শব্দ, প্রতিটি বাক্য যেন এই রাতের সঙ্গে একাত্ম হয়ে যাচ্ছে।


এক কাপ ধোঁয়া ওঠা কফি হাতে নিয়ে বসি ছাদের এক কোণে। দূরে কোথাও কুকুরের হালকা ডাক শোনা যাচ্ছে, মাঝে মাঝে কোনো রাতজাগা পাখির ডানার শব্দ বাতাসে মিশে যাচ্ছে। জোছনার আলোয় নিজের ছায়াটার দিকে তাকাই, মনে হয়, আমিও কি এক টুকরো গল্প হয়ে গেছি এই রাতের?


বইয়ের পাতা উল্টাই, কিন্তু চোখ বারবার আকাশের দিকে চলে যায়। হয়তো চাঁদও আজ কিছু বলতে চায়, হয়তো এই রাতও কোনো গল্প বুনছে—যে গল্পের নাম ‘অবাক করা নিস্তব্ধতা’, যেখানে চাঁদ, জোছনা, হালকা বাতাস আর একাকী আমি এক অদৃশ্য সুতোয় বাঁধা পড়ে আছি...

Saturday, March 8, 2025

অন্ধকার অরণ্য

 


২রা রমাদান-২০২৫। মাগরিবের নামাজপড়ে বেরিয়ে এলাম রাস্তায়। সারাদিন রোজার ক্লান্তিতে, ইফতারের পর পুরো শরীর ঘেমে আসছে। আবাসিক থেকে বেড়িয়ে এলাম খোলা মাঠে।

গোধূলির লালচে আলো ধীরে-ধীরে মলিন হয়ে আসছে। পশ্চিমের আকাশ যেন আগুনের মতো জ্বলছে, আর তার নিচে ছড়িয়ে আছে অস্পষ্ট ধোঁয়াশা। ৫০/৬০ একরে পরিত্যক্ত প্লটগুলোর ভেতর আমি একা। চারপাশে ঝোপঝাড়, জঙ্গল আর ভাঙাচোরা কংক্রিটের স্তূপ পড়ে আছে। যেন বহুদিন কেউ এখানে আসেনি। বাতাস ভারী, নিস্তব্ধতা চারপাশে জমাট বেঁধেছে।


হাঁটতে-হাঁটতে আমি একটা নিচু দেয়ালে হেলান দিয়ে বসি। দূরের 'মেঘনা ফ্রেশ সিমেন্ট ফ্যাক্টরি' আর 'ফ্রেশ সিরামিক্সে' -এর চুল্লিগুলোকে এখন ধোঁয়াশার ভেতর ভাসমান দ্বীপের মতো লাগছে। দু’শ মিটার দূরে মেঘনা নদীর একটা ছোট্ট শাখা এঁকেবেঁকে চলে গেছে। যার পানিতে সন্ধ্যার আলো মিশে এক অদ্ভুত গাঢ় রঙ নিয়েছে।


পাশেই অনেক বড়সড় একটি রেন্ডি গাছ। বিশালাকার কান্ড নিয়ে, মাটির দিকে ঝুলিয়ে আছে। লতাপাতায় ভরপুর। তার নিচে জমাট বেঁধেছে গাঢ় অন্ধকার। থেকে-থেকে পুরো মাঠজুড়ে ঝোপঝাড়ের মাঝে বেড়ে উঠেছে বড়ই গাছ।


হঠাৎ ঝোপের ভেতর থেকে একটা চাপা আওয়াজ শোনা গেল। মনে হলো, যেন কেউ নিঃশ্বাস ফেলছে, ভারী আর গভীর একটা নিঃশ্বাস। আমি থমকে গেলাম। বাতাসে একটা পোড়া গন্ধ ভেসে এলো—কেমন যেন ভেজা মাটির গন্ধের সঙ্গে মিশে থাকা পোড়া মাংসের মতো!


আমি উঠে দাঁড়িয়ে সামনে এগিয়ে গেলাম, কিছু দূরে একটা উঁচু টীলা দেখে সেখানে বসার জন্য পা বাড়ালাম। ঠিক তখনই, পিছনের ঝোপ থেকে এক হু হু ডাক উঠল! শেয়াল!


আমি ঘাড় ঘুরিয়ে তাকাতেই চোখ কপালে উঠে গেল। ঝোপের মধ্যে লালচে দৃষ্টির কয়েকটা জোড়া চোখ জ্বলজ্বল করছে। তাদের শরীর পুরোপুরি দেখা যাচ্ছে না, কিন্তু বোঝা যাচ্ছে তারা এগিয়ে আসছে—ধীরে, নিঃশব্দে।


আমার বুক ধড়ফড় করে উঠল। দ্রুত পা চালিয়ে সামনের দিকে এগোতেই ডান পাশের আরেকটা ঝোপ থেকে হঠাৎ কয়েকটা শেয়াল একসঙ্গে চেঁচিয়ে উঠল। তাদের চিৎকারের ভেতর একটা কর্কশ, অস্বাভাবিক কম্পন আছে—এ যেন শেয়ালের ডাক নয়, যেন কোনো বিকৃত আত্মার আর্তনাদ!


আমি দৌড় দিলাম। পায়ের নিচে শুকনো ডালপালা ভেঙে যেতে লাগল, চারপাশে অন্ধকার ঘন হয়ে আসছে। একবার পিছনে তাকাতেই দেখতে পেলাম—শুধু শেয়াল নয়, মানুষের মতো অবয়বের কিছু জিনিস ছায়ার ভেতর দাঁড়িয়ে আছে! তারা কি মানুষ? নাকি অন্য কিছু?


পাগলের মতো ছুটতে লাগলাম, কিন্তু আশেপাশের ঝোপঝাড় থেকে যেন আরও আরও অনেক চিৎকার ভেসে আসছে। পায়ের তলায় শুকনো মাটি ধসে যেতে লাগল, আর আমি হোঁচট খেয়ে পড়ে গেলাম। মাথার ঠিক ওপরে একটা শীতল নিঃশ্বাস অনুভব করলাম।


উঠে দাঁড়ানোর আগেই অনুভব করলাম, পেছন থেকে একটা ঠান্ডা হাত আমার কাঁধে পড়েছে…


নারায়ণগঞ্জ, ঢাকা

Sunday, September 24, 2023

পাকুরতলে সোনালি দুপুর

 

 আমার কৈশোরের দিনগুলোর বিশাল একটা অংশ এখানেই লুকিয়ে আছে। শীতের সকালে খালি পাায়ে ছুটে আসতাম এই পাকুরতলীতে। এসে দেখতাম, পাখিরা কিচিরমিচির রবে পাকুরের ঘুম ভেঙে দিয়েছে। ততক্ষণে পূর্বাকাশ রক্তিম হয়ে উঠেছে। শিশিরভেজা সবুজ ঘাসে সোনালী রোদ হেঁসে উঠেছে। গ্রীষ্মের অলস দুপুরে মা যখন ঘুমোতে বলতো— মায়ের চোখ ফাঁকি দিয়ে ছুটে আসতাম পাকুরতলীতে। পাশ্বের গ্রামের রাখাল ছেলেদের ঘুড়ি উড়া, লুডু, পাইতা আরও নাম না জানা নানান খেলা দেখতাম। দুপুর গড়িয়ে বিকেল কাটিয়ে সবাই যখন বাড়ি ফিরতো, পাকুরতলীতে আনমনা হয়ে কি যেন ভাবতাম। দেখতাম, দূরের পল্লি থেকে ঝাঁকে ঝাঁকে পাখি উড়ে আসছে এই পাকুর গাছে। কিচিরমিচির রবে মাতিয়ে তুলতো পাকুর গাছটা। যেন সারাদিনের কর্মবিবরণী বলে দিচ্ছে পাকুরকে। গোধূলিলগ্নে পূর্বাকাশ যখন রক্তিম হয়ে আসতো, বিস্ময়ভরা চোখে তাকিয়ে দেখতাম— সূর্যের লুকোচুরি। চারদিকে যখন অন্ধকার হয়ে আসতো, খানিক দূরে তাকিয়ে দেখতাম— কে যেন দাঁড়িয়ে আছে। কাছে গিয়ে দেখতাম, সে আমার 'মা'। আমাকেই খুঁজেফিরে এখানেই এসেছে। আজ এই অনুভূতীগুলো এই ইট-পাথরের চার দেয়ালের মাঝে বন্দী হয়ে আছে!

জনপ্রিয় আর্টিকেলগুলো দেখুন...

জামতলীর দিনগুলো...

  গ্রামে ফারুক নামে আমার এক প্রতিবেশী আছে। কৈশোরের দিনগুলোর বড় একটা অংশ তার সাথেই কেটেছে। চৈত্রী দুপুরে- ছাতিফাটা রোদে মাঠ-ঘাট যখন খাঁ খাঁ ক...