Posts

জনপ্রিয় আর্টিকেলগুলো দেখুন...

দালানবাড়ির গল্প

Image
  ধানক্ষেতের মাঝে দাঁড়িয়ে আছে প্রাচীণ দু'টি দালানবাড়ি  গ্রামে এসেছি দু’দিন হবে। সকালের খাবার খেয়ে বারান্দায় এসে দাঁড়ালাম। ঘন গাঢ় নীল আকাশের বুক চিরে ভেসে যাচ্ছে সাদা মেঘ। মেঘের ফাঁক গলে উঁকি দিচ্ছে সূর্য্যিমামা। বাড়ির গেট পার হতেই মা চেঁচিয়ে বললেন, “রৌদ্রে কোথাও যাস্ না।” আমিও চেঁচিয়ে বললাম, “এ-ই আসছি!” —বলেই বাহিরে বেরিয়ে এলাম। আমাদের গ্রামের গা ঘেঁষে বয়ে গেছে আঁকাবাঁকা মেঠোপথ। পথের পাশে পুকুর। পুকুরপাড়ে শিমুল, খেজুর, হিজল, কাঁঠাল ও সজনেগাছ। পুকুরের ওপাড়ে ধানক্ষেতের বুক চিরে— মাথা তুলে দাঁড়িয়ে আছে পাঁচশত বছরের প্রাচীন দু'টি দালানবাড়ি। আমি পথে বেরিয়ে পড়লাম। রাখাল ছেলেরা গরু-ছাগল নিয়ে যাচ্ছে মাঠে। রাস্তার পাশে কদম ও আকাশমণিগাছের সারি। আমি পুকুরপাড়ে এসে বসলাম। একটি মাছরাঙা ঠোঁটে মাছ তুলে শিমুলের ডালে গিয়ে বসলো। পুকুরের জলে রোদের কিরণ লেগে চিকচিক করছে। মাঝে-মাঝে মৃদু বাতাসে ধানক্ষেত থেকে ভ্যাপসা গন্ধ ভেসে আসছে। ছোট্ট একটি ফড়িং দেখে— হাত বাড়ালাম, টের পেয়েই ফড়িংটি ছুটে গেলো ধানক্ষেতে। আমিও নেমে গেলাম আলপথে। আমার পায়ের শব্দে দিগ্বিদিক ছুটছে অসংখ্য ঘাসফড়িং। একটি কোমল স্পর্শে দাঁড়িয়ে ...

জোছনাভেজা দিনলিপি

Image
  [একটি কালভার্ট, একফালি চাঁদ আর থোকা-থোকা ভালোলাগা] ০২ জুলাই ২০২৬; বৃহস্পতিবার; রাত ১:৪৫ টা  আজকের রাতটাকে লিখে না রাখলে অন্যায় হতো। কিছুদিন আগেও আমার সবুজ ছোট্ট গ্রামটা বন্যার পানিতে প্রায় ডুবে ছিল। সেই পানিই আজ পূর্ণিমার জোছনায় রূপ বদলে ফেলেছে। মনে হচ্ছে, প্রকৃতি যেন নিজের হাতে সব দুঃখ ধুয়ে তার ওপর সাদা আলো বিছিয়ে দিয়েছে। গ্রাম থেকে মেঠোপথ ধরে একটু দূরের ছোট্ট একটি কালভার্টে এসে বসেছি। হিমেল বাতাসে বাবরি চুলগুলো এলোমেলো হয়ে উড়ছে। সামনে যতদূর চোখ যায়, হাঁটু-সমান পানিতে ভরা মাঠ। পূর্ব আকাশে থালার মতো পূর্ণ চাঁদ, আর সেই চাঁদের আলো পানির বুকে নেমে এসে পুরো গ্রামটাকে রূপালি নীরবতায় মুড়ে দিয়েছে। পানির বুক থেকে ভেসে আসছে ব্যাঙের ডাক। রাস্তার দু'ধারে ঝিঁঝি পোকার একটানা সুর। দূরের সড়কে সারিবদ্ধ গাড়ির আলোগুলো ধীরে ধীরে এগিয়ে যাচ্ছে। মনে হচ্ছে, রাত নিজের জন্য কোনো শব্দ করছে না; প্রকৃতির প্রতিটি প্রাণী মিলে তার হয়ে কথা বলছে। মাঠের মাঝখানে একজন মানুষ হাঁটু পানিতে দাঁড়িয়ে মাছ ধরছেন। তাঁর ছোট্ট লাইটের আলো আর জোছনা মিলে এমন এক দৃশ্য তৈরি করেছে, যা কোনো ছবিতে পুরোপুরি ধরা য...

জামতলীর দিনগুলো...

Image
  গ্রামে ফারুক নামে আমার এক প্রতিবেশী আছে। কৈশোরের দিনগুলোর বড় একটা অংশ তার সাথেই কেটেছে। চৈত্রী দুপুরে- ছাতিফাটা রোদে মাঠ-ঘাট যখন খাঁ খাঁ করতো— মা আমাকে বিছানায় নিয়ে ঘুমপাড়ানি গানে, মাথায় হাত বুলিয়ে দিতো। আমিও চক্ষুবুজে চুপকরে থাকতাম। মায়ের হাতটা যখন থেমে যেতো, চোখমেলে দেখতাম- মা ঘুমিয়ে পড়েছে। পা টিপে টিপে বেরিয়ে আসতাম। এসে দেখতাম ঘরের পিছনে সজীব, মীম ও নাঈমসহ ফারুক আমার জন্য অপেক্ষা করছে। তারাও ঘুমফাঁকি দিয়ে পালিয়ে এসেছে। ফারুকের নেতৃত্বে ধানক্ষেত পেরিয়ে ছুটে যেতাম খাঁ-দের খেজুর বাগানে— সেখানে বড়সড় একটা জামগাছ আছে। ধানক্ষেতের ভেপসা গরম, মাথার উপর কাঠফাটা রোদ এরমাঝে আলপথে হেঁটে চলা! টসটসে লাল হয়ে যেতাম। কপাল বেয়ে টপটপ করে ঘাম ঝরতো। জামের নেশায় তখন এসব কিছুই মনে হতো না। জামতলীতে এসেই ধপ্ করে বসে পরতাম। আর ফারুক কয়েক লাফেই জামগাছের মাথায় উঠে যেতো। যেকোনো গাছ বাইতে বড্ডপটু সে! তারপর উঠতো— নাঈম, সজীব ও মীম। সবার শেষে উঠতাম আমি। ফারুক, নাঈম আর সজীব গাছের মগডাল থেকে থোকা থোকা জাম নিয়ে আসতো। মীম ও আমি সেগুলো জমা করতাম। সাথে নিয়ে যাওয়া পলিথিন ভরে গেলে, ফারুক ও নাঈম জামগুলো নিয়ে আগে নেমে য...

সূর্যাস্তের আগে...

Image
  প্রতীকী ছবি : ইজতিমা ময়দানে ব্লগার ও একদল তৃণমূল (খাবারের স্তুপে) সূর্যাস্তের আগে বিশ্ব ইজতিমার আখেরী মুনাজাত শেষ হয়েছে গতকাল। আজ তুরাগ তীরের সেই বিশাল ময়দান দেখতে বের হলাম।  কৌতূহল হচ্ছিল— যে মাঠে গতকালও লাখো মানুষের ঢল নেমেছিল, আজ সেটি কেমন দেখায়? কামারপাড়া ব্রিজ পার হয়ে এগোতে লাগলাম। আশেপাশে এখনও কিছু দোকান খোলা। শীতবস্ত্র বিক্রি হচ্ছে, চায়ের কাপে ধোঁয়া উঠছে। ময়দানের মূল ফটকের কাছে এসে দেখলাম, মেডিকেল ক্যাম্পের সামিয়ানা এখনও খোলা। পানির ট্যাংক, নিরাপত্তা বক্স, ময়দানের মানচিত্র— সবকিছুই যেন গতকালের স্মৃতি আঁকড়ে দাঁড়িয়ে আছে। মনে হচ্ছিল, এই তো গতকালও এখানে মানুষ ছিল। লাখো মানুষ। এত মানুষ যে, মাটিও দেখা যাচ্ছিল না। আজ চারদিকে শুধু নীরবতা। আমি উত্তর-পূর্ব কোণের গেট দিয়ে ময়দানে ঢুকলাম। কিন্তু কয়েক কদম এগোতেই হঠাৎ বুকের ভেতরটা ধক করে উঠল। দূরে একটা ডাস্টবিন। তার চারপাশে কিছু মানুষ জড়ো হয়ে আছে। প্রথমে ভাবলাম, হয়তো পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার কাজ চলছে। কিন্তু কাছে যেতে যেতে বুঝলাম, আমি ভুল দেখিনি— বরং যা দেখছি, তা বিশ্বাস করতে পারছি না। মানুষগুলো ডাস্টবিনের ভেতর থেকে খাবার কুড়িয়ে খাচ্ছ...

বিদায়ের ছায়ায় স্মৃতির আড্ডা

Image
  টোলপ্লাজার দিনগুলো যেন এখনো চোখের সামনে ভেসে ওঠে। জীবনের প্রথম কর্মক্ষেত্র, প্রথম অভিজ্ঞতা, প্রথম আপনজনের মতো প্রিয় সহযাত্রী—সব মিলেই ছিল এক অমূল্য অধ্যায়। আমি ছিলাম সবার ছোট্ট, আর তাই হয়তো সবার স্নেহ আমাকে আরও আলাদা করে ঘিরে রেখেছিল। স্মৃতির পাতায় এখনো উজ্জ্বল হয়ে ওঠেন নাসিম স্যার, ইঞ্জিনিয়ার ওবায়দুল স্যার তাঁদের আন্তরিক হাসি আর অনুপ্রেরণার হাতছানি। সহকর্মীদের ভিড়ে সবুজের প্রাণখোলা হাসি, নয়ন ভাইয়ের ভরসাময় উপস্থিতি, রাফসানের সরলতা আর আজিজুলের অশেষ আন্তরিকতা—সবকিছু মিলেই টোলপ্লাজার আকাশটা ছিল অন্যরকম উজ্জ্বল। পড়ন্ত বিকেলের আলোয়, যখন মেঘনার তীরে রোদ ঝিমিয়ে পড়ত, তখনই আমাদের আড্ডা জমে উঠত। নদীর ঢেউয়ের সঙ্গে মিশে যেত হাসি, গল্প আর স্বপ্নের রঙিন ছটা। মনে হতো, পৃথিবীর সব ক্লান্তি গলে যাচ্ছে এই সান্ধ্য আড্ডার উষ্ণতায়। কিন্তু জীবন থেমে থাকে না। বিদায়ের বাঁকে এসে দাঁড়ালে, সময় আমাদের আলাদা পথে টেনে নিয়ে যায়।  ছোট্ট জীবনে যত বিদায় জমেছে, তার ভাঁজে ভাঁজে এখন স্মৃতির ঝুড়ি পূর্ণ হয়ে উঠেছে। আর সেই ঝুড়ির গভীরে লুকিয়ে আছে আমাদের হাসি, আমাদের কথা, আমাদের বন্ধুত্বের অমলিন মুহূর্তগুলো। আজ যখন ফি...

চড়ুইভাতি

Image
  ফেলে আসা কৈশোরের দিনগুলোতে... তখন আমি মাদারীপুরে অধ্যায়নরত ছিলাম। ইংরেজি ২০১৭/১৮ খ্রিস্টাব্দ হবে।  প্রায় ছ'সাতমাস পর গ্রামে গেলাম। আমাকে পেয়ে সজীব, ফারুক, নাঈম আর মীম উৎফুল্ল হয়ে উঠেছিলো। খবর পেয়ে— তানজীমুল বাড়ি থেকে ছুটে এলো। নিতাই থেকে ছোট ফুপি এলো। আমাকে পেয়ে রিয়াদ ও হৃদয়ও খুব খুশি হলো।  সেদিন পড়ন্ত বিকেলে নাঈম, ফারুক ও সজীব সিদ্ধান্ত নিলো- আমাকে নিয়ে আজরাতে চড়ুইভাতি করবে।  রিয়াদ, হৃদয় আর তানজীমুল থাকায় এবারের চড়ুইভাতি ভিন্নভাবে একটু বড় পরিকল্পনায় হবে!  সজীব চাল দেবে, আমি মশলা ও তেল, নাইম রশুন আর আদা, ফারুক হলুদ, মরিচ ও লবণ নিয়ে আসবে। সাথে প্রত্যেকে ২০ টাকা করে দেবো; যা দিয়ে বাজার থেকে মাংস কিনে আনবো। জায়গা ঠিক হলো—নাঈমদের পুকুরপাড়ের খেজুর গাছের আড়ালে। সেখানে কেউ দেখতে পাবে না। যাবেও না। প্ল্যান মতো, সূর্যের আলোতেই সবাই মিলে সেখানকার আশপাশের ঝোপঝাড় পরিষ্কার করলাম।  প্রস্তুতির ঝড়ো হাওয়া... সন্ধ্যা ঘনিয়ে আসছে। পরিকল্পনা মতো সবাই বাড়ি থেকে লুকিয়ে-চুরিয়ে— চাল-ডাল, পিয়াজ, মরিচ, আদা-রশুন, ঘর বানানোর কাপড় ইত্যাদি নিয়ে এসে, পুকুরপাড়ে লুকিয়ে রাখলাম। কিন্তু ম...

চাঁদ-জোসনা-আমি

Image
  জানালার পর্দাটা সরাতেই একমুঠো জোছনা ছিটকে এলো মেঝেতে। পরিচ্ছন্ন আর পরিষ্কার আকাশে জ্বলজ্বল করছে আধখানা চাঁদ। ম্যাক্সিম গোর্কির মা উপন্যাসটা হাতে নিয়ে ছাদে উঠে এলাম। চারদিকে জোছনায় প্লাবিত হয়ে আছে। নিস্তব্ধ রাত, হালকা বাতাস, আর মৃদু পাতার খসখস শব্দ—সবকিছু মিলিয়ে এক অপার্থিব অনুভূতি। চাঁদের আলো ছড়িয়ে পড়েছে ছাদের রেলিং ধরে থাকা মানিপ্ল্যান্টের পাতায়। বাতাসের দোলায় পাতাগুলো যেন রূপালি আভায় জ্বলজ্বল করছে। আমি বইয়ের পাতায় চোখ রাখি, কিন্তু মনে হয়, প্রকৃতি আজ গল্পের চেয়েও বেশি জীবন্ত। প্রতিটি শব্দ, প্রতিটি বাক্য যেন এই রাতের সঙ্গে একাত্ম হয়ে যাচ্ছে। এক কাপ ধোঁয়া ওঠা কফি হাতে নিয়ে বসি ছাদের এক কোণে। দূরে কোথাও কুকুরের হালকা ডাক শোনা যাচ্ছে, মাঝে মাঝে কোনো রাতজাগা পাখির ডানার শব্দ বাতাসে মিশে যাচ্ছে। জোছনার আলোয় নিজের ছায়াটার দিকে তাকাই, মনে হয়, আমিও কি এক টুকরো গল্প হয়ে গেছি এই রাতের? বইয়ের পাতা উল্টাই, কিন্তু চোখ বারবার আকাশের দিকে চলে যায়। হয়তো চাঁদও আজ কিছু বলতে চায়, হয়তো এই রাতও কোনো গল্প বুনছে—যে গল্পের নাম ‘অবাক করা নিস্তব্ধতা’, যেখানে চাঁদ, জোছনা, হালকা বাতাস আর একাকী আমি এক অদৃশ্য...