দালানবাড়ির গল্প
![]() |
| ধানক্ষেতের মাঝে দাঁড়িয়ে আছে প্রাচীণ দু'টি দালানবাড়ি |
গ্রামে এসেছি দু’দিন হবে। সকালের খাবার খেয়ে বারান্দায় এসে দাঁড়ালাম। ঘন গাঢ় নীল আকাশের বুক চিরে ভেসে যাচ্ছে সাদা মেঘ। মেঘের ফাঁক গলে উঁকি দিচ্ছে সূর্য্যিমামা। বাড়ির গেট পার হতেই মা চেঁচিয়ে বললেন, “রৌদ্রে কোথাও যাস্ না।” আমিও চেঁচিয়ে বললাম, “এ-ই আসছি!”
—বলেই বাহিরে বেরিয়ে এলাম।
আমাদের গ্রামের গা ঘেঁষে বয়ে গেছে আঁকাবাঁকা মেঠোপথ। পথের পাশে পুকুর। পুকুরপাড়ে শিমুল, খেজুর, হিজল, কাঁঠাল ও সজনেগাছ। পুকুরের ওপাড়ে ধানক্ষেতের বুক চিরে— মাথা তুলে দাঁড়িয়ে আছে পাঁচশত বছরের প্রাচীন দু'টি দালানবাড়ি।
আমি পথে বেরিয়ে পড়লাম। রাখাল ছেলেরা গরু-ছাগল নিয়ে যাচ্ছে মাঠে। রাস্তার পাশে কদম ও আকাশমণিগাছের সারি। আমি পুকুরপাড়ে এসে বসলাম। একটি মাছরাঙা ঠোঁটে মাছ তুলে শিমুলের ডালে গিয়ে বসলো। পুকুরের জলে রোদের কিরণ লেগে চিকচিক করছে। মাঝে-মাঝে মৃদু বাতাসে ধানক্ষেত থেকে ভ্যাপসা গন্ধ ভেসে আসছে।
ছোট্ট একটি ফড়িং দেখে— হাত বাড়ালাম, টের পেয়েই ফড়িংটি ছুটে গেলো ধানক্ষেতে। আমিও নেমে গেলাম আলপথে।
আমার পায়ের শব্দে দিগ্বিদিক ছুটছে অসংখ্য ঘাসফড়িং।
একটি কোমল স্পর্শে দাঁড়িয়ে গেলাম। দেখি, কী কিউট একটি ব্যাঙের ছানা পায়ে এসে বসেছে!
নিঃশব্দে দাঁড়িয়ে থাকি। শিশিরভেজা ঘাসে আমার পা জড়িয়ে গেছে, মনে হয় সবুজ সমুদ্রে সাঁতার কাটছি।
ঘাসফড়িং-দের ছোটাছুটি, প্রজাপতিদের উড়ে চলা আর সবুজের মৌ মৌ গন্ধে— কোমর অবধি আধভেজা হয়ে, পৌঁছাই দালানবাড়ির সামনে।
দালান দুটি যেন সবুজ সমুদ্রের মাঝে ভেসে থাকা দু'টি দ্বীপ। ইটগুলো লাল টুকটুকে, খশে-খশে পড়ছে। চারদিকে পরগাছা, ঝোপঝাড়, গাছের শিকড় আর বাদুড়ের বাসা।
পূর্বদিকের দেয়ালে বটগাছের শিকড় এঁকেবেকে উঠেছে, প্রথম দেখায় যে-কেউ সাপ আবিষ্কার করতে পারে। উত্তরে একটি বাসঝাড়, পশ্চিমে কয়েকটি কলাগাছ আর দক্ষিণদিকে রয়েছে ভিতরে প্রবেশের পথ ও বিস্তৃত ছোট্ট একটি উঠোন। পুরো উঠোনজুড়ে ঝোপঝাড়। কোমর পর্যন্ত ঘন জঙ্গল। উঠোনের পশ্চিম-দক্ষিণ কোণে ছোট্ট একটি টিলা। টিলায় বেড়ে উঠেছে একটি বড়ইগাছ আর ছোটবড় অনেক গর্ত। ইটের আধুলি ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে। দিনের আলোতেও মাটিগুলো কেমন স্যাঁতস্যাঁতে। চারদিকের পরিবেশটা কেমন ভুতুড়ে, খুউব গোমট আর থমথমে।
পা টিপেটিপে ভেতরে ঢুকলাম, স্যাঁতস্যাঁতে গন্ধ। গোমট অন্ধকার। ফ্লাশলাইট জ্বালালাম। মেঝেতে ভাঙা-ভাঙা ইট পড়ে আছে। দেয়ালগুলো খশেখশে পড়ছে। বাদুড়েরা কিচিরমিচির করছে। আমার উপস্থিতি টের পেয়ে, কয়েকটি বাদুড় কানের কাছ দিয়ে উড়ে গেলো।
আমি দ্রুত বেড়িয়ে এলাম। হিজলের ডালে বাদুড়টিকে ঝুলন্ত দেখে ভিডিও ক্যামেরা ওপেন করলাম। দরজা থেকে দু'এক কদম সামনে এগুতেই দেখি— বিশাল এক সাপ খোলস ছাড়ছে! আমি সাপটির মাঝামাঝি দাঁড়িয়ে! ভয় আর আতঙ্কে বাকরুদ্ধ হয়ে যাই। লোমগুলো শিউরি উঠে— এই বুঝি ফনা তুলে ছোবল মারবে! দিশাহারা হয়ে ফোন পড়ে যায়, আমি লুটিয়ে পড়ি।
আমি অচেতন। এভাবে কেটে যায় ক্ষাণিক বেলা...
চোখ খুলতেই দেখি—সূর্য পশ্চিমে ঢলে পড়েছে। ঘামে ভেজা নিথর শরীরে পড়ে আছি মাটিতে। ফোনটা পড়ে আছে পাশেই, তাতে ভিডিও চলছে। তার পাশেই সাপের খোলস। পানি-পিপাসায় বুক ফেটে যাচ্ছে। এক ইঞ্চি নড়াবার শক্তিটাও যেন হারিয়ে ফেলেছি। প্রাণবায়ুটা এখনই বুঝি বেরিয়ে যাবে! চক্ষু ঘুরিয়ে দেখি, কেউ নেই। নিশ্চল-নিশ্চুপ, গোমট আর নিস্তব্ধ হয়ে আছে চারদিকের পরিবেশ।
লেজ দুলিয়ে একটি দোয়েল উড়ে এলো, আমার পায়ের কাছ থেকে ছোট্ট একটি পোকা তুলে নিলো। কোথা থেকে দু'টি ঘুঘু উড়ে এলো, আমার মাথার পাশ দিয়ে দ্রুত হেঁটে গেলো। একটি ছোট্ট টুনটুনি পাতার ভেতর আড়াল হলো। চোখ ফিরিয়ে দেখি, একটি গর্ত থেকে মাটি ঠেলে বেরিয়ে আসছে ইঁদুর। আমার নাকের ডগায় দু'টো প্রজাপতি খেলা করছে...
হটাৎ চারদিকের পরিবেশ একটু থমকে গেলো। ইঁদুরটি দ্রুতই গর্তে ঢুকে গেলো। পাখিরা উড়ে গেলো। প্রজাপতিরা লুকিয়ে গেলো। ধানক্ষেত থেকে বেরিয়ে এলো একটি বনবেড়াল। আমি শত চেষ্টাতেও নিজেকে নড়াতে পারলাম না। আমি কখনোই এতো কাছ থেকে বনবেড়াল দেখি নি। কুরআনের কতিপয় আয়াতকে নিজের সঙ্গী বানালাম। বেড়ালটি আমার খুব কাছ দিয়ে ধানক্ষেতে নেমে গেলো।
আবারও গর্ত থেকে বেরিয়ে এলো ইঁদুর। গাছের ডালে উড়ে এলো পাখি। ধানক্ষেত থেকে ছুটে এলো ঘাসফড়িং। প্রজাপতিরা খেলতে শুরু করলো...
আমি মনে-মনে আল্লাহকে ডাকছি আর প্রাণপাখিটাকে ছলেবলে ধরে রাখছি। প্রকৃতি যেন মৃত্যু আর জীবনের সীমান্তরেখায় নীরব স্বাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়েছে।
হটাৎ টের পেলাম, মাথার দিক হতে কে যেন আসছে। ঘাসফড়িংগুলো দিগ্বিদিক ছুটছে। পাখিরা উড়ে যাচ্ছে, ইঁদুরটি গর্তে লুকিয়েছে।
দেখি, এক লোক ছুটে এসেছে। একঝাঁক প্রশ্ন ছুঁড়ে দিয়ে, আমাকে কাঁধে করে খাঁ-দের খেজুরবাগানে নিয়ে এলো। মুহুর্তেই কোথা থেকে পানি এনে, পান করিয়ে দিলো। জীবনের সজীবতা আবার ফিরে আসে শরীরে। কপালের ঘাম মুছে দিয়ে জানতে চাইলো— কে আমি? কেন জীবন সায়াহ্নে দাঁড়িয়ে?
আমি ফোন হাতে তুলে দেখি—৪ ঘণ্টা ৩৬ মিনিট ভিডিও ধারণ! ভিডিওতে দেখা যায়, সাপটি আমার পায়ের উপর দিয়ে চলে যাচ্ছে। আমার নিথর শরীর শুয়ে আছে মাটিতে।
লোকটি অবাক হয়ে বাড়ির পথ দেখিয়ে দিলো।
ততক্ষণে সূর্যও নিস্তেজ। বিকেল হয়ে এসেছে। আমি ফিরে চলেছি—প্রকৃতির কোলে, ধানক্ষেতের ভ্যাঁপসা গন্ধ আর ঘাসফড়িংয়ের উড়াউড়ির মাঝে...
উত্তরা, ঢাকা-১২৩০
আর্টিকেলটি "লেখকপত্র" ম্যাগাজিনে প্রকাশিত

Comments
Post a Comment